আমাদের সমাজে একটি ভ্রান্ত ধারণা বহুদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে। এক শ্রেণির মৌলভী বা ধর্মীয় বক্তা সূরা আন-নিসা’র ৫৯ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করে থাকেন যে, মুসলমানদের অবশ্যই “আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আলেমদের” অনুসরণ করতে হবে। তাদের ব্যাখ্যায় “আলেম” বলতে বোঝানো হয় যে কেউ, যিনি আরবি ভাষায় কুরআনের আয়াত পড়তে বা মুখস্থ করতে পারেন— এমনকি, যদি তিনি এর অর্থ, প্রেক্ষাপট বা মর্ম অনুধাবন না-ও করেন।
কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো — এই আয়াতে আল্লাহ সত্যিই কাদের আনুগত্যের কথা বলেছেন? “আলেম” বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? “উলিল-আমর” বা কর্তৃত্বশালী বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে?
এই বিশ্লেষণে আমরা আয়াতটির প্রকৃত অর্থ, প্রেক্ষাপট এবং আমাদের সমাজে প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা আলোচনা করবো — যেন বোঝা যায়, ইসলাম কী ধরনের নেতৃত্ব ও আনুগত্যের কথা বলে।
আয়াত ও এর অনুবাদ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর, এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশালী (উলিল-আমর), তাদেরও। আর যদি তোমরা কোনো বিষয়ে মতভেদ কর, তবে তা ফিরিয়ে দাও আল্লাহ ও রাসূলের (বিধানে), যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালীন জীবনে বিশ্বাস রাখো। এটি উত্তম এবং ফলাফলের দিক থেকেও শ্রেষ্ঠ।”
(সূরা আন-নিসা, আয়াত ৫৯)
আয়াতের প্রেক্ষাপট
এই আয়াত মদিনা যুগে অবতীর্ণ হয়, যখন নবী মুহাম্মদ (সা.) ইসলামী রাষ্ট্রের সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলছিলেন। তখন মুসলমানদের মধ্যে ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের নীতি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই আয়াতে তাই মুসলমানদের সামনে এক মৌলিক নীতি স্থাপন করা হয় — নেতৃত্ব ও আনুগত্যের সম্পর্ক কেবল বিশ্বাসের উপর নয় বরং ন্যায়, জবাবদিহিতা ও আল্লাহর নির্দেশনার উপর নির্ভরশীল।
তিন স্তরের আনুগত্য
আয়াতে তিন শ্রেণির আনুগত্যের কথা এসেছে —
- আল্লাহর আনুগত্য:
সর্বপ্রথম আনুগত্য একমাত্র আল্লাহর প্রতি। তাঁর বিধান (কুরআন) সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত কর্তৃত্ব। কোনো ব্যক্তির নির্দেশ, ফতোয়া বা রায় যদি কুরআনের মূলনীতির পরিপন্থী হয়, তা মানা যাবে না।
“তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, নতুবা তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে।”
(সূরা আনফাল ৮:৪৬)
- রাসূলের আনুগত্য:
রাসূল (সা.)-এর আনুগত্য মানে তাঁর মাধ্যমে প্রেরিত আল্লাহর বার্তা ও তাঁর বাস্তব প্রয়োগের অনুসরণ করা। তিনি কুরআনের জীবন্ত দৃষ্টান্ত, কোনো স্বতন্ত্র বিধানদাতা নন। তাই তাঁর আনুগত্যও আল্লাহর নির্দেশের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
“যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করল।”
(সূরা নিসা ৪:৮০)
- উলিল-আমর (أُولِي الْأَمْرِ):
“উলিল-আমর” শব্দের আক্ষরিক অর্থ — যাদের হাতে দায়িত্ব বা কর্তৃত্ব ন্যস্ত।
অর্থাৎ, যারা সমাজের নেতৃত্ব, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করে।
তবে ইসলামী দৃষ্টিতে সেই নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য তখনই, যখন তা আল্লাহর বিধান ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত হয় এবং জনগণের কল্যাণে নিয়োজিত থাকে।
কুরআন স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে —
“আর যদি তারা তোমাকে নির্দেশ দেয় আমার (আল্লাহর) সাথে এমন কিছুকে শরিক করতে, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না।”
(সূরা আনকাবুত ২৯:৮)
এই আয়াত শুধু পিতা-মাতার ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো কর্তৃত্ব বা নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও একটি সাধারণ নীতি স্থাপন করে:
আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো আনুগত্য নেই।
আরও বলা হয়েছে —
“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের আলেম ও ধর্মযাজকদেরকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে।”
(সূরা আত-তাওবা ৯:৩১)
অর্থাৎ, যখন মানুষ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের অন্ধভাবে অনুসরণ করে, আল্লাহর বিধানকে উপেক্ষা করে, তখন তা প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের শিরকের সমান হয়ে যায়।
অতএব, কুরআনের নীতিই হলো —
আনুগত্য কেবল আল্লাহর বিধান অনুসারে ন্যায়নিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রতি।
যে নেতৃত্ব আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে, তার আনুগত্য করা কোনোভাবেই ইসলামী নয়।
মতভেদ ও কুরআনিক বিচার
আয়াতে বলা হয়েছে —
“যদি তোমরা কোনো বিষয়ে মতভেদ কর, তবে তা ফিরিয়ে দাও আল্লাহ ও রাসূলের (বিধানে)।”
এটি ইসলামী চিন্তাধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিচারনীতি।
অর্থাৎ, কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় মতভেদ দেখা দিলে চূড়ান্ত বিচার হবে কুরআনের ন্যায়ের মানদণ্ডে।
“আর যেসব বিষয়ে তোমরা মতভেদ করো, তার নিষ্পত্তি আল্লাহ করবেন।”
(সূরা আশ-শূরা ৪২:১০)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে কুরআনই চূড়ান্ত রেফারেন্স; কোনো মানবমত বা সম্প্রদায়ের ব্যাখ্যা তার বিকল্প হতে পারে না।
আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা
এই আয়াত আজও সমান প্রাসঙ্গিক। বর্তমান মুসলিম সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, ধর্মীয় নেতা বা দলীয় মোল্লারা নিজেদেরকে “উলিল-আমর” বা “আলেম” দাবি করে জনগণের অন্ধ আনুগত্য চায়। অথচ ইসলাম কখনও অন্ধ অনুসরণকে সমর্থন করে না।
কুরআন বারবার আহ্বান করেছে —
“তারা কি চিন্তা করে না কুরআনের প্রতি?”
(সূরা নিসা ৪:৮২)
অর্থাৎ, ইসলাম প্রত্যেক বিশ্বাসীকেই আহ্বান করে চিন্তা, প্রজ্ঞা ও বোধের আলোকে ধর্ম বোঝার জন্য।
সুতরাং, কোনো শাসক বা ধর্মীয় নেতা যদি অন্যায়ের পথে চলে, তবে তার বিরুদ্ধেও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই প্রকৃত ঈমানের প্রকাশ।
উপসংহার
সূরা আন-নিসা আয়াত ৫৯ ইসলামী সমাজে ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্ব ও যুক্তিনির্ভর আনুগত্যের নীতি স্থাপন করেছে।
এতে শেখানো হয়েছে —
- আনুগত্য হবে কেবল আল্লাহ ও তাঁর বিধানের প্রতি;
- নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা নয়, বরং ন্যায়ের দায়িত্ব;
- এবং আলেম বা নেতা তখনই সম্মানযোগ্য, যখন সে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলে।
অতএব, ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃত আনুগত্য মানে অন্ধ অনুসরণ নয়; বরং ন্যায়, যুক্তি ও সত্যের প্রতি অটল থাকা — এই পথই আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানবমুক্তির পথ।








Leave a Reply